মেনু নির্বাচন করুন
খবর

মাঠপ্রশাসন : দুর্দিনের কান্ডারী

কালজয়ী অমর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যর একটি কবিতা  দিয়ে শুরু করতে চাই।

‘বিক্ষোভ’ কবিতায় সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছেন-

দৃঢ় সত্যের দিতে হবে খাঁটি দাম,

হে স্বদেশ, ফের সেই কথা জানলাম।

জানে না তো কেউ প্রথিবী উঠছে কেঁপে

ধরেছে মিথ্যা সত্যের টুঁটি চেপে,

কখনো কেউ কি ভূমিকম্পের আগে

হাতে শাঁখ নেয়, হঠাৎ সবাই জাগে?

যারা আজ এত মিথ্যার দায়ভাগী,

আজকে তাদের ঘৃণার কামান দাগি।

চারপাশে সব মিথ্যা, প্রতারনা আর লৌকিকতার মাঝে সত্যের জয় হোক। সত্যকে সত্য বলতে হবেই। সত্যের জয়গান গাইতেই হবে, নইলে আমাদের নাগরিক দায় পরিশোধিত হবে না। আজ কাল কে কাল, আর সাদা কে সাদা বলার দিন এসেছে। সত্য আজ সমাগত। তাই চোখের সামনে যে সত্যটা দেখি, তার জয়গান গাই। যারা মিথ্যা ও মিথ্যা অভিনয়ে টইটম্বুর, তাদের প্রতি ঘৃনা ঢেলে দেয় জাতি। নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) তান্ডবে পুরো দুনিয়া আজ শশ্মানে পরিণত হয়েছে। এ যেন এক মৃত্যুপুরী। প্রকৃতির কাছে মানুষ আজ অসহায়। প্রাণঘাতী করোনাভাইরসটি আঘাত হেনেছে আমাদের বাংলাদেশেও। বাংলাদেশে প্রথম ৪ মার্চ প্রথম নভেল করোনাভাইরাস ধরা পরে। দিন দিন অদৃশ্য ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব যেন বেড়েই চলেছে। এ নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত সারাবিশ্বে কভিড-১৯ শনাক্তের সংখ্যা ৫৫ লাখ ৮ হাজার ৯০০ এবং মৃতের সংখ্যা ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫০৮ জন। বাংলাদেশে শনাক্তের সংখ্যা ৩৬ হাজার ৭৫১ আর মৃতের সংখ্যা ৫২২।  মৃত্যুর মিছিল থামছে না। স্বজনের আহাজারিতে আকাশ ভারি হয়ে যাচ্ছে। মানুষ মরনশীল। জন্মালে মরতে হবে। কিন্তু এ কেমন মৃত্যু? এ কেমন বিদায়? যে বিদায়ে আপনজন ছুঁতে পারে না। বড়ই পাতা গরম জলে গোসল দিতে পারে না। কাফনের কাপড় পড়াতে পারে না। কবরে শোয়াতে পারে না। কবরে দিতে পারে না মমতায় ভরা মাটির শেষ টুকরাটাও। এ কেমন অমানবিকতা? পৃথিবীতে বিদ্যমান সব ধর্মের স্ব স্ব রীতি অনুযায়ী মৃত্যুর পর সম্মানজনক শেষকৃত্যর বিধান আছে। কিন্তু দুনিয়াতে এ কেমন মৃত্যুর বিধান এলো যে, মানুষ মানুষের পাশে দাড়ায় না। মানুষ মানুষকে ফেলে চলে যায়। এটা এমন এক মৃত্যু যেখানে প্রিয়জন কাছে আসেনা। মৃতদেহ মেঝেতে পড়ে থাকে। সিড়িতে পড়ে থাকে প্রিয়জনের নিথর মরদেহখানি। আপনজন ভয়ে দূরে চলে যায়। কেউ লাশ নিতে আসে না। হাসপাতালে, রাস্তায় লাশ ফেলে চলে যায়। এগিয়ে আসে না নিজ স্বামী, স্ত্রী, পিতা, পুত্র, কন্যা বা কোনো আত্মীয়স্বজন। এই চরম অমানবিকতা ও মানবিকতার এই কঠিন বিপর্যয়কে আমরা রীতিমত এখন নিয়ম বানিয়ে ফেলেছি। আর এমনই এক নির্মমতার ছড়াছড়ির মাঝে মানবিকতার ঝান্ডা উড়িয়ে আমাদের মাঝে এসে হাজির হন,পাশে দাড়ান মমতার হাত দিয়ে সুমহান হৃদয়ের কিছু মানব বন্ধু, যারা চিন্তা করে না নিজের জীবনের ঝুঁকির কথা। এ মৃত্যু ঝুঁকিকে উপেক্ষা করেই তারা মাঠে নেমেছেন। যাদের কথা বলছি,তারা হলেন সরকারের মাঠ প্রশাসন।

সমগ্র দেশব্যাপী লকডাউন এবং জনসাধারণের শারিরিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা বাস্তবায়নে মূল নেতৃত্বে আছেন জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আগত উপহার সামগ্রী ও খাদ্যদ্রব্য বিতরণ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, দরিদ্রদের তালিকা তৈরি, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের দাফন-কাফনসহ সৎকারের সব ধরনের কাজে যুক্ত থাকতে হচ্ছে তাঁদের। এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারাও যখন মৃতের পরিজন কিংবা প্রিয়জনেরাও পাশে থাকছে না। এসব করতে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছে মাঠ প্রশাসনের ব্যাক্তিরা। এর মধ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাই বেশি। আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেকই আবার নারী ম্যাজিস্ট্রেট।

 

 

মানবতার এমনই এক দুঃসময়ে সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলেও বিবেকের টানে ত্রাতা হয়ে আজ এগিয়ে এসেছেন প্রশাসনের লোকজন। ডিসি, এনডিসি, ইউএনও, সেনাবাহিনী, পুলিশের এসপি, এডিশনাল এসপি, এএসপি, এসআই, কনস্টেবলসহ অতি মানবীয় গুণাবলীর কিছু মানুষ সেচ্ছায় আর্ত মানবতার সেবায় এগিয়ে এসেছেন। প্রশাসনের এ মানুষগুলোর ঘুম  নেই। অকুতোভয়ে ছুটে যাচ্ছেন করোনাক্রান্তের পাশে। গরীব অসহায় দুস্থ মানুষের পাশে। এমনও দেখা গেছে পুলিশ মাথায় করে উপহার সামগ্রীর বস্তা পৌঁছে দিয়েছেন গরীব অসহায়ের ঘরে। করোনায় আক্রান্তদের সাহস জোগাচ্ছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন, মনোবল বাড়াচ্ছেন। ফোনে কিংবা স্বশরীরে সবসময় খবরাখবর নিচ্ছেন। নিজেরা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন জেনেও নির্ভয়ে অসহায়দের পাশে থাকছেন। মানুষের সেবা করতে গিয়ে আবার মানবদরদী এ মানুষগুলোও করোনাভাইরাসে আক্রান্তও হয়েছেন। তারপরও তারা ভেঙে পড়েননি। থেমে যাননি।

বর্তমানে সারাদেশে ৪৮৬ জন ইউএনও রয়েছেন। এদের মধ্যে ১৪০ জন ইউএনও নারী। এ ছাড়া আট জেলায় নারী কর্মকর্তারা জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। তারাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। প্রায় প্রতিটি উপজেলায় সহকারী কমিশনারও (ভূমি)-এসিল্যান্ড আছেন। বর্তমানে মাঠ প্রশাসনে তাদের কাজের পরিধি বেশি। ইউনিয়ন পর্যায়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ইউএনওদের সব কাজের সমন্বয় করতে হচ্ছে। তারা প্রতিটি ইউনিয়নে গিয়ে গিয়ে দুস্থ, অসহায়, কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষের তালিকা করছেন এবং করোনাভাইরাস মোকাবিলার পাশাপাশি অসহায় মানুষদের প্রধানমন্ত্রীর উপহার প্রদানের মাধ্যমে সহায়তা নিশ্চিত করছেন। 

ক্লান্তিহীন এক যোদ্ধার নাম এস এম ফেরদৌস, মানিকগঞ্জের সম্মানিত  জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট। একজন সুদক্ষ অভিভাবক ও একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। জেলার মানুষকে করোনামুক্ত রাখতে ক্লান্তিহীন ছুটে চলেছেন। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের ফোন আসা মাত্রই জেলা  প্রশাসক নিজে গিয়েই হাজির হন অসহায়ের বাড়ীতে। মধ্যরাতেও খাবার নিয়ে হাজির জেলা প্রশাসক এস এম ফেরদৌস। এমন ঘটনাও জাতি দেখেছে।

করোনা যুদ্ধের আরেকজন সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন, নরসিংদী জেলার সুযোগ্য জেলা প্রশাসক। একজন মহান নারী তবে একটি বিপ্লবী নাম। পরাজয়ে ডরায় না এ বীর, বরং পরাজয় শব্দটি যার অভিধানে নেই। নিশ্চিত জয়ের লক্ষ্যে অবিরত ছুটছেন তিনি। তিনি আশাবাদী, বিজয় অবশ্যম্ভাবী। তিনি জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন মানুষের জন্য। করোনা যুদ্ধে যিনি অগ্রগামী সৈনিক। তিনি দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছেন দুর্বার গতিতে আপন গন্ত্যবের দিকে। লক্ষ্য একটাই প্রিয় মাতৃভূমি  ও দেশের মানুষের কল্যান ও সুরক্ষায় কাজ করা। করোনা যুদ্ধে তার অবদান অগ্রগন্য।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার এর উপ-পরিচালক মঞ্জুর শাহরিয়ারের  স্ত্রী, পুত্র,  কন্যা সবার কোভিড-১৯ পজিটিভ। মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে আজ নিজের পরিবারের সবাই করোনা আক্রান্ত। যার ফেসবুক ওয়ালের বায়োতে লেখা আছে- আমার একশ কদম পথচলা যদি একজন মানুষের উপকারে আসে, তাহলে আমি হাটবো না কেন? এমন হৃদয়বান মানুষ খুব কমই আছে। 

মানুষের কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে ও জনগনকে সেবা দিতে গিয়ে গতি ৬ এপ্রিল  মারাও গিয়েছে জাতির সূর্যসন্তান উপসচিব  ও দুদক এর পরিচালক জনাব জালাল সাইফুর রহমান।

শেরপুর জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নমিতা দে। এ প্রশাসক মানুষের কান্না, মানুষের অভাব ও যাতনা সইতে পারেন না। সরকারি উপহারের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগেও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন নীরবে, সাহায্য পাঠিয়ে উপকৃত করেছেন শত শত পরিবারকে। এমন অকৃত্রিম জনতার বন্ধু আর কোথায় পাবে জাতি?     

মানবতার এমনই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও মো. বদরুদ্দোজা শুভ। করোনা উপসর্গে মারা গেছে শুনে গ্রামের কোনো লোক এগিয়ে আসেনি। এমনকি মসজিদের ইমাম পর্যন্তও জানাযা পড়াতে রাজি হননি। উপায়ন্তর না দেখে এ নির্বাহী কর্মকর্তা মৃত ব্যক্তির জানাযা পড়িয়েছেন। জীবনে প্রথম জানাযার নামাজের ইমামতি করে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। 

শুধু তাই নয় মানবতার অনন্য নজির রেখেছেন নোয়াখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম সরদারও। নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে মানুষকে বাঁচাতে উপজেলার সর্বত্র জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সমাজে এমন অনেকেই আছেন যারা লোকলজ্জায় কোন সাহায্য বা উপহার চাইতে পারে না। হাত বাড়াতে পারে না। এমন উপলব্ধি থেকে এসব মানুষের ঘরে ঘরে রাতের আঁধারে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন স্থানে বিতরণ করছেন মাস্ক, সাবান ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার।

নারায়ণগঞ্জ করোনাভাইরাসের আতুঁর ঘর। ইতালি ফেরত এক প্রবাসী থেকে এখানে প্রাণঘাতী ভাইরাসটি ধরা পরে। করোনার শুরু থেকেই এই জেলার ডিসি মহোদয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার ও জেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সিভিল সার্জন, জেলার ফোঁকাল পারসন করোনা প্রতিরোধে নানা প্রচারনা চালিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে করোনা আক্রান্তের বাড়ি লকডাউন, শারিরিক দূরত্ব নিশ্চিত করা, রাস্তা বা কোন অনুষ্ঠানে জনসমাগম না করা, এলাকার মসজিদগুলোতে মাইকিং করে মানুষকে সচেতন করা ও স্বাস্থ্য বার্তা পৌঁছানো, ঘরে থাকতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে তাদের কাউকে কাউকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়েছে। সদর উপজেলার জনপ্রিয় নির্বাহী অফিসার নাহিদা বারিক। রাতের আঁধারে তাকে দেখা গেছে করোনাভাইরাস সংক্রামিত আতঙ্কে ঘরে থাকা নিম্ন আয়ের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে, খাদ্য দিতে। নারায়ণগঞ্জ সদরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ছুটে চলেছেন করোনা যুদ্ধের এক নারী  সৈনিক হিসাবে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ মে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসাবে ১০০ মেয়ের হাতে শিশু খাদ্য তুলে দেন তিনি। ফতুল্লার দেলপাড়া এলাকায়

একই ঘরে করোনা আক্রান্ত ১৭ জনকে এলাকার কিছু লোক তাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে সেনাবাহিনীর সহায়তায় এদেরকে ধাওয়া করেন। আক্রান্তদের বাড়িটি লকডাউন করেন, তাদেরকে খাদ্যসামগ্রী দেন। এলাকায় হ্যান্ড মাইকিং করে মানুষকে বোঝান, আক্রান্তরাও এ এলাকারই মানুষ। আক্রান্তদের মধ্যে একজন জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিক্যাল অফিসারও আছেন।

গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাব্বির আহমেদ। সততায়, নিষ্ঠায় ইস্পাত কঠোর যার মনোবল। সাব্বির আহমেদ জনতার ইউএনও। মাঝরাতেও তিনি অসহায় মানুষের বাড়ী খাবার নিয়ে ছুটেছেন। এলাকাবাসীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে  প্রায় ১৫০ পরিবারকে লকডাউনের আওতায় আনেন। তার এলাকায় করোনাভাইরাস দেখা দিলে লকডাউনের বিষয়টি মসজিদের মাইকে ইমাম সাহেবদের মাধ্যমে ঘোষণা করেন। এলাকার সকল মুসল্লিদের বাড়িতে নামাজ আদায় ও বাড়িতে অবস্থান করার জন্য অনুরোধ করেন। ২৪ এপ্রিল, জনপ্রিয় এই নির্বাহী কর্মকর্তা মহেশপুর গ্রামের প্রসূতি মায়েদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার সামগ্রী ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে রাত দিন তার কর্মতৎপরতা ব্যাপক প্রশংসা পায়। শুধু তাই নয় এ উপজেলা করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহের জন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বুথও উদ্বোধন করেন তিনি। এখানে উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে অবৈধ দখলে থাকা প্রায় ৩ কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার করে পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাব্বির আহমেদ। তিনি উপজেলার তিলছড়ায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে গোপালপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেন যার নাম তিল ছড়া পার্ক। বেদে ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের মাঝে খাবার সামগ্রী পৌছে দিয়েছেন। দিনরাত বাইরে থেকে  জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম করেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। অথচ তার ছোট পুত্র শিশু মুসাব্বির সারাদিন পথচেয়ে বসে থাকে বাবার। মানুষকে ঘরে থাকার জন্য কাশিয়ানী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাব্বির আহমেদ ‘ইউএনও কাশিয়ানী’ নামের একটি অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন।

তিনি লিখেছেন- ‘আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করছি, আপনি নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র ও দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করছেন তো? তা হলে আইন মেনে ঘরে থাকুন, পরিবার ও সমাজকে নিরাপদে রাখুন। এক বছর ১০ মাসের শিশুসন্তানকে কাছে নিতে ভয় হয়। আমার নিজ উপজেলা শিবচরে লকডাউনে থাকা আমার অতিপ্রিয় মুখ বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা হয় না বহুদিন। তিনি আরও লিখেছেন, ‘প্রতিদিন প্রায় পাঁচ শতাধিক ফোন ও ফেসবুক মেসেজ; হাটবাজার, মাঠঘাটে অসচেতন মানুষের অহেতুক ঘোরাঘুরি; নিষেধাজ্ঞা না মেনে দোকানপাট খোলা রাখা এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষের হোম কোয়ারেন্টিন না মানার প্রবণনতা প্রভৃতি মধ্যরাতেও ঘুমাতে দেয় না। ঘুমাতে যাই এ প্রত্যাশা নিয়ে, যাতে ঘুম থেকে উঠেই কোনো নতুন ভোর দেখব। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না। আমাদের সবটুকু সক্ষমতা দিয়ে কাশিয়ানীবাসীকে ভালো রাখার চেষ্টা করছি। মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করছি, যাতে মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করেন। সব কিছুর পর কাশিয়ানীর একজন হয়ে আপনাদের নিকট বিশেষ অনুরোধ ঘরে থাকুন, প্রিয়জনকে সময় দিন, তাদের নিয়ে সবাই নিজ নিজ বাড়িতে নিরাপদে থাকুন।’ 

তাঁর স্ট্যাটাসটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক ভাইরাল হয়। এতে অনেকেই লাইক ও কমেন্ট করেন এবং ইউএনওর ভূয়সী প্রশংসা করেন।

চাঁদপুর জেলার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কানিজ ফাতিমা। তিনি আপোষহীনভাবে লড়ে যাচ্ছেন সমাজের সব সামাজিক বাধা বিপত্তি আর দুস্কৃতিকারীদের সাথে। এলাকায় যোগদানের পর থেকে বেশ সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। করোনাভাইরাসের দুর্যোগকালেও বসে নেই তিনি। ফোনে কিংবা স্বশরীরে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। এলাকার করোনা প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে যেমন শারিরিক দূরত্ব নিশ্চিত, মানুষদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, ঘরে থাকা নিশ্চিত করা, বিদেশ ফেরত প্রবাসিদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা, অসহায় মানুষদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করেছেন। শারিরিক দুরত্ব নিশ্চিতকরনে বিদেশ ফেরৎ লোকের লকডাউনের মধ্যে ঘটা করে বিয়ের আয়োজন বন্ধ করা এবং করোনার প্রকোপ শুরু থেকে আদ্যাবদি চাঁদপুরে সদরের এ নির্বাহী কর্মকর্তার নানা কর্মতৎপরতা মানুষের মধ্যে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। 

 

আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সোহাগ হোসেন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। করোনাকালীন সময়ে  রাতদিন আড়াইহাজারের প্রত্যন্ত অঞ্চল চষে বেড়িয়েছেন। আড়াইহাজারের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট ও এসিল্যান্ড উজ্জল হোসেনের নামও এসেছে আলোচনায়। 

করোনাভাইরাস দুর্যোগে বসে নেই কক্সবাজারের রামু উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রণয় চাকমা। করোনা থেকে সাধারণ মানুষকে নিরাপদে রাখতে সচেতনতা সৃষ্টি, বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের ঘরে থাকা, দ্রব্যমূল্যের কৃত্রিম সংকট রোধে রাত দিন তার নানা উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে। ফোনে কিংবা স্বশরীরে যখনই যে তথ্য পেয়েছেন সেখানেই ছুটে গেছেন তিনি। 

সারাদেশে করোনাভাইরাসের কারণে সবাই যখন আতঙ্কিত। সে সময়ে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী এগিয়ে আসেন। করোনাভাইরাস থেকে উপজেলার সর্বস্তরের মানুষকে বাচাঁতে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করছেন। বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমনÑ উপজেলার প্রতিটি হাটবাজারে শারিরিক দুরত্ব বজায় রাখা ও করোনাভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে মানুষকে ঘরমুখী করছেন। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার হাটবাজার নিয়মিত মনিটরিং করে সরকারি নির্দেশ অমান্যকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং দ্রব্যমুল্য নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছেন। দিনমজুর কর্মহীন হয়ে পরা মানুষের ঘরে খাদ্যসামগ্রীও পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি।

 

করোনার জাতীয় সংকটকালীন মুহূর্তে থেমে নেই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পুলিশ সদস্যরাও। যে হাতে বন্দুক, গুলি, পিস্তল, গোলাবারুদ থাকত। সে হাতে ত্রাণের বস্তা নিয়ে দুর্গম পথে ছুটে চলেছেন। সেই হাতে লাশের খাটিয়া বহন করে কখনও কোদাল হাতে কবর খুঁড়ছেন আবর কখনো মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে করোনায় মৃত্যের লাশের দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছেন। আবার অনেক পুলিশ কর্মকর্তা গভীর রাতে গরীব অসহায়দের ঘরে ঘরে গিয়ে খাদ্য ও অর্থ সহায়তা করছেন। নীলফামারীর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম এর সততা ও সহযোগিতা, দুর্যোগে মানবতার কল্যাণে ঝাপিয়ে পড়ার ঘটনা সারা দেশের মানুষ দেখেছে। কিভাবে পুলিশ জনতার অকৃত্রিম বন্ধু হয়, তা এবার দেখিয়েছে পুলিশ।  

পটুয়াখালীতে টানা তিন দিন পানি খেয়ে কাটিয়েছেন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা অসহায় বৃদ্ধ সোবাহান হাওলাদার। গত ১ এপ্রিল রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার ঘরে খাবার নিয়ে হাজির হন পটুয়াখালীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ  মইনুল হাসান। 

রাঙ্গামাটি জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ। যিনি করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে অদ্যাবদি চষে বেড়চ্ছেন পাহাড়ি এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চল। করোনা রোধে জেলা পুলিশ বন্ধ করে দিয়েছে রাঙ্গামাটি জেলায় প্রবেশের সব পথ। চৌকষ এ পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রতিদিনই জেলার সড়কগুলোতে টহল দেয়াসহ মানুষকে সচেতন করা, মাস্ক ব্যবহারে উদ্বুধ করা, ঘরে থাকা নিশ্চিত করা প্রভৃতি কাজ করছেন। হ্যান্ড মাইকেও মানুষকে ঘরে থাকতে বলেছেন। 

৬ এপ্রিল ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলায় গভীর রাতে মানুষের বাড়ি গিয়ে খাদ্য সামগ্রীসহ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক নিয়ে হাজির হন জেলা পুলিশের প্রধান পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান। গত ৯ এপ্রিল যশোরে পরিবারের সদস্যদের ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর অঞ্জলী রায় নামে এক গৃহবধু পুলিশকে ফোন দিলে ১ ঘণ্টার মধ্যে খাদ্য নিয়ে হাজির হন যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামাল আল নাসের।

কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের বৃদ্ধা জিন্না বেগমের বাড়িতেও খাবার নিয়ে হাজির হন জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার। মৌলভীবাজারে সেখানকার কিছু পুলিশ সদস্য নিজেদের রেশনের খাবার গরীব অসহায়ের মাঝে বিতরণ করেছেন। আরো এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে। কিছুদিন আগে ডিএমপির গুলশান বিভাগের ডিসি সুদীপ কুমার চক্রবর্তী নিজের ফেসবুকে লেখেন, করোনার এ পরিস্থিতিতে ঘরবন্দি থেকে যারা অর্থ ও খাবারের কষ্টে আছেন কিন্তু লজ্জায় বলতে পারছেন না তাদের পরিচয় গোপন রেখে খাদ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন। অন্যদিকে ‘আপনি ঘরে থাকুন, দোকানই যাবে আপনার ঘরে’ এ সে­াগানকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) করোনাভাইরাসের ভয়াবহতায় বাসায় অবস্থান করা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের কঠিন সংকটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মাঠে ময়দানে তাদেরও সংসার আছে। পরিবার পরিজন আছে। ছেলে মেয়ে আছে। আছে বাবা, মা। এমনও আছে যে,  ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ব্রাক্ষণবাড়িয়ার বিজয়নগরের ইউএনও মেহের নিগার ও করোনা সংকটে বেড়িয়ে পড়েছেন মানুষের সেবায়। মানুষের প্রতি তার মমত্ব ভবিষ্যত প্রজন্মের ঝুঁকিও তাকে আটকাতে পারেনি। জাতির এ বিপদের দিনে দেশের কান্ডারী এ উজ্জ্বল মানুষগুলো নিজের ও পরিবারের কথা চিন্তা না করে করোনাক্রান্তদের পাশে থাকছেন। খেটে খাওয়া, কর্মহীন, অসহায় মানুষদের পাশে ছুটে যাচ্ছেন। কখনো করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সচেতনতার জন্য প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন। আবার কখনো বা রাস্তার মোড়ে পুলিশ সদস্যরা গানে গানে মানুষকে সচেতন করছেন। টেলিভিশনসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছি গাজীপুরের এসপি শামসুন্নাহারকে লকডাউনের মধ্যে মানুষকে ঘরে থাকার জন্য গণসচেতনতামূলক নানা কথায় গানে শহরের সড়ক পথ মাতিয়ে রাখতে। এমন সব উদ্যোগের সবকিছুই করোনা দুর্যোগে মানুষের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য করেছেন। এ সময় যেখানে আপন মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সেখানে এসব মানুষগুলো সামাজিক দায়িত্ব মনে করে বিবেকের তাড়নায়, মানবতার টানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে রাস্তায় নেমেছেন।

এভাবেই করোনা ক্রান্তিকালে দেশ ও জাতির দুর্দিনে কঠিন সংকটকালে করোনাক্রান্তদের পাশে থাকছেন সারাদেশের মাঠ প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের বিজ্ঞ অফিসাররা। যখন কেউ পাশে থাকেনি, করোনা আক্রান্তদের কাছ থেকে যখন আপনজনেরাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ, তখন নিবিড়ভাবে মানবতার ফেরিওয়ালার মতো পাশে থেকেছেন জাতির সূর্যসন্তানেরা। তেমনি একজন অনুপম নারী ও জনবান্ধব ইউএনও- উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহের নিগার। তিনি ব্রাক্ষণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার ইউএনও। ঘরে ছোট ছেলে রেখে এবং নিজে পাঁচ মাসের অন্তসত্বা হওয়া সত্বেও তিনি ছুটে চলেছেন। জাতির এহেন ক্রান্তিলগ্নে তিনি নিজের স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা ভাবেননি।  যার এ সময়ে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকার কথা, অথচ তিনি ছুটি না নিয়ে দেশ ও জাতির সেবায় আরো অধিকতর মনোবল নিয়ে আতœনিয়োগ করেছেন।  

আরেকজন মানবতার ফেরিওয়ালার নাম না বললে অন্যায় হবে, যিনি হলেন ব্রাক্ষণবাড়িয়া সদর উপজেলার এসিল্যান্ড, এ উপজেলার জনবান্ধব এসিল্যান্ড হিসাবে খ্যাত, তিনি হলেন এবিএম মশিউজ্জামান জনি। যখন যেখান থেকে ডাক এসেছে ছুটে গেছেন দেশপ্রেমের মহান মন্ত্র বুকে ধারন করে প্রজাতন্ত্রের সেবক হিসাবে। গরীব, অসহায় ছিন্নমূল পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন খাদ্য, স্বা সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে।  কর্মহীন হয়ে পড়া অসহায় দিনমজুর ও গৃহকর্মীদের খাদ্য নিয়ে রাত অথবা দিন যখন যেখান থেকে আওয়াজ এসেছে, সেখানেই ছুটেছেন এবিএম মশিউজ্জামান জনি।

ব্রাক্ষনবাড়িয়ার এনডিসি আব্দুল্লাহ আল বাকী ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সালেক মুহিতের নামও এসেছে গণমাধ্যমে। এমন জনবান্ধব প্রশাসন আজ সারাদেশে মহীয়ান হয়েছে, দৃষ্টান্ত রেখেছে উজ্বলভাবে। সার্বিকভাবে যার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, প্রেষণা ও প্রেরণা হিসাবে সাহস যুগিয়েছে এসকল বীরসেনানী ও করোনা যুদ্ধের সম্মুখ সমরের ফ্রন্ট লাইন ফাইটার নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটগনদের, তিনি হলেন ব্রাক্ষনবাড়িয়ার বাতিঘর ও প্রজ্ঞাবান জেলা প্রশাসক ও সম্মানিত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট জনাব হায়াত -উদ-দৌলা খান। তিনি একজন বলিষ্ঠ নেতা, যার আহবানে ও নির্দেশনায় আজ ব্রাক্ষনবাড়িয়ার মাঠে ঘাটে, তৃণমূল মানুষের পাশে অকৃত্রিম বন্ধু হিসাবে দাড়িয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। 

নারী যোদ্ধার তালিকায় আপোষহীন একটি নাম শাফিয়া আক্তার শিমু। তিনি নরসিংদীর মনোহরদীর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার। অকুতোভয় বীর সেনানীর মতো ঝাপিয়ে পড়েছেন করোনা যুদ্ধে। মানুষের কল্যাণে অন্তঃপ্রাণ এ মেধাবী অফিসার ছুটে চলেছেন উপজেলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। 

আরেকজন অনন্য সাধারণ সুযোগ্য নারী কর্মকর্তার কথা বলছি। ‘স্নেহের আঁচল’ নামে ভালবাসার এক অনন্য ছাউনি তৈরি করেছে। জনগনের চোখে পড়ার মতো।  দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন লক্ষীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবরিন চৌধুরী। 

যখন নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সারবিশ্বের মতো বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লকডাউনের কারনে মানুষ যখন কর্মহীন হয়ে পড়ছে, তখন তিনি ছুটে গেছেন খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার মানুষের কাছে। এই দুর্দশা ও হতাশাগ্রস্ত অসহায় মানুষের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ.ন.ম বদরুদ্দোজা(রুমান)। 

বলতে হবে জনাব আলমগীর হোসেনের কথা। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর এর উপজেলা নির্বাহী অফিসার।  রাত যত অন্ধকারময় হোক না কেন, সকালে সূর্যের দেখা মিলবেই- এ বিশ্বাস বুকে নিয়ে চাপানবাবগঞ্জের মানুষকে বাঁচাতে লড়ে যাচ্ছেন। মানুষের কল্যানে বিলিয়ে দিচ্ছেন নিজেকে। 

দেশ মাতৃকার এ কঠিন সময়ে জনগনের প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় দিচ্ছেন মাঠ প্রশাসন। শুধু তাই নয়,তারা ইতিহাস তৈরি করছেন। প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) সরকারিভাবে সরবরাহ না করায় চিকিৎসকদের পিপিই বানালো মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা প্রশাসন।

চট্টগ্রামের হাটহাজারি উপজেলার ইউএনও জনাব রুহুল আমিন। আরেকজন নিবেদিত বন্ধু। তার অবদান বলে শেষ করা যাবে না। খাওয়া, ঘুম বিসর্জন দিয়ে দিনরাত নিরলস ছুটে চলছেন। এ কর্মকর্তা নিজ জীবনের কথা একটিবার ভাবছেন না। নিজ ঘরে ছোট কন্যা শিশু আরিশার জীবনের ঝুঁকিকে উপেক্ষা করে দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে অবিরাম ছুটছেন রুহুল আমিন।    

গাজীপুর জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট ও ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা (সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারী) জনাব মোহাম্মদ আবুল মনসুর আহমেদ একজন নিভৃতচারী মানবতার বন্ধু। সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রাদেশ পরিপালনের একজন লড়াকু সৈনিক। প্রচারবিমুখ এ মানুষটি নিয়ত বিলিয়ে দিচ্ছেন নিজে।ে অতি অল্প সময়ে জনতার বন্ধু হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজেকে। নিজ ঘরে দুই কন্যা সন্তান যার একজন সদ্যজাত, তাদের জীবনে করোনা সংক্রমনের এত বড় ঝুকি নিয়েও ছুটে চলেছেন প্রান্তর থেকে প্রান্তর, লোকালয় থেকে লোকালয়ে। কন্যা রাশা এবং রাফাকে কোলে নিতে ভয় পান তিনি, কন্যারা পাগল হয়ে থাকেন বাবার কোলে উঠতে। 

করোনামুক্ত বাংলাদেশ ও নতুন একটি শুভ্র প্রভাতের প্রতীক্ষায় প্রত্যয়দীপ্ত অঙ্গীকার নিয়ে ছুটছেন জনাব মোহাম্মদ আবুল মনসুর। এ কাতারে আছেন গাজীপুরের ম্যাজিষ্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক জনাব  এস.এম.তরিকুল ইসলাম।

আরো একজন নারায়ণগঞ্জের ই-সেবা কেন্দ্রের সহকারী কমিশনার তানিয়া তাবাসসুম তমা। বর্তমানে তিনি, তার স্বামী, মা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। তিনি ছাড়াও আক্রান্ত হয়েছেন আরো দুইজন সহকারী কমিশনার। 

গণমাধ্যমের একটি খবর বেশ নাড়া দিয়েছেন জনগণকে। ‘মৃত অবস্থায় বিছানায় পড়েছিলেন একজন হিন্দু বৃদ্ধ, চিতায় তুললেন ইউএনও।’ এ শিরোনামের সংবাদ দেশবাসীর হৃদয় রক্তক্ষরণ হয়েছিল। স্থানীয় কেউ এগিয়ে না আসায় ভ্যানে মরদেহ তোলা ও চিতায় তোলার কাজে হাত দেন ইউএনও।  কিন্তু বিপত্তি বাধে মুখাগ্নি নিয়ে। কয়েক দফা ফোন করলেও মৃত বিশ্বজিতের হাজারো স্বপ্নে লালিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ূয়া ছেলে মুখাগ্নি করতে এগিয়ে যায়নি। উপায়ান্তর না দেখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কয়েকজন সাংবাদিককে সঙ্গে নিয়ে নিজেই সেই মরদেহ সৎকার করেন। 

করোনায় আক্রান্ত চাদপুর জেলার হাজীগঞ্জের ইউএনও। উঁকি দিয়ে মাকে খুঁজছে শিশু, সাড়া দিচ্ছে না করোনায় আক্রান্ত মা। ছোট্ট কোমলমতি পা দুটি উঁচু করে, নরম তুলতুলে হাত দিয়ে শক্ত করে জানালার গ্রিল ধরে মাকে দেখার চেষ্টা করছে। মা মা বলে ডাকছে বছর তিনেকের শিশু ছেলে। তবু সাড়া মিলছে না। মায়ের সাড়া না পেয়ে, চিৎকার, চেঁচামেচি তারপর কাঁদতে শুরু করা। এমনই এক চিত্র ইউএনও বৈশাখী বড়ুয়ার ঘরে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশনে থাকায় নিজের সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে পারছেন না তিনি।

যখন পরিবার পরিজন, আতœীয় স্বজন কেউ পাশে থাকেনি, তখন নীরবে ও সরবে পাশে থেকেছে মাঠপ্রশাসনের বন্ধুরা। কখনো ভাইয়ের মত, কখনো সন্তানের মতো হয়ে পাশে থেকেছে মাঠ প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের কর্মীরা। তারা আজ জাতির দর্পনে পরিণত হয়েছে। তারাই জাতির বিবেকের অনুমাপক। এমন পরম বন্ধু ও নিঃস্বার্থ ও নিজের আরাম ত্যাগী মানুষ আজকাল বিরল। আমি খুব সানান্য ক'জনের কথাই আলোচনা আনতে পেরেছি, যাদের কথা লিখেছি, শুধু তারাই করেছে এমন নয়। এমন অসংখ্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ কাজের জন্য সুনাম কুড়িয়েছেন। এবারের করোনা ক্রান্তিকালে মাঠপ্রশাসনের অফিসারদের অবদান ভুলবার নয়।

লেখক:  ব্যাংকার

 

 

https://bonikbarta.net/home/news_description/230652/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A0%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%A8-:-%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%85%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%95-%E0%A6%93-%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A1%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%80?fbclid=IwAR2--0p1kkMh1UfjrNzDsykR6Wfd1DbkaaIOteJ4HMREqIRtEwkvEQCoDHA

ছবি


ফাইল


প্রকাশনের তারিখ

২০২০-০৪-২৬

আর্কাইভ তারিখ

২০২১-১১-২৫


Share with :

Facebook Twitter